শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

২৪ এর বিপ্লব কেন অনন্য সাধারণ

আমি ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দেখেছি। তখন আমার বয়স এতই কম ছিল যে সে সম্পর্কে বোঝার মতো কোনো বুদ্ধি আমার হয়নি। পরবর্তীতে যখন কিশোর হলাম তখন ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানলাম এবং কিছু কিছু বুঝতে পারলাম। তখন পুলিশের গুলীতে নিহত হয়েছিলেন সম্ভবত à§­ কি à§® জন। এদের মধ্যে আমরা শুধুমাত্র বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার এবং সফিউলের নাম জানতে পারি। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল প্রধানত ঢাকায়। মফস্বলে ঢাকার তীব্রতা নিয়ে ছড়ায়নি। ভাষা আন্দোলনকে তাই কেউ বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান বলেননি। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল গভীর এবং ব্যাপক। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিরোধী ঐক্যজোট হয়েছিল। এই জোটটির নাম ছিল যুক্তফ্রন্ট। এই জোটটি একত্র করেছিল মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খাস ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহওরাওয়ার্দী, নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মওলানা আতাহার আলী প্রমুখকে। ভাষা আন্দোলনের জোয়ারে আসলে তেমন ভাটা লাগেনি। যেটুকু লেগেছিল সেটি ৫৪ সালের নির্বাচনে আবার জোরদার হয়। 

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ওপরে যে ৪ জন নেতার নাম উল্লেখ করা হলো তাদের মধ্যে তিনজনই ছিলেন কালজয়ী। সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা ফজলুল হক প্রমুখ বেশ কয়েক বছর আগে লোকান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু আজও তারা মানুষের স্মৃতিপটে অম্লান। তাই দেখা যায় এবারের জুলাই আগস্ট বিপ্লবের পর জাতির পিতার একতরফা বয়ান এবং ঘোষণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। চতুর্থ সংশোধনীর ৩৪ অনুচ্ছেদের (খ) উপঅনুচ্ছেদে শেখ মুজিবকে জাতির পিতা বলা হয়েছে। তারপর পঞ্চদশ সংশোধনীতে তাকে জাতির পিতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের পর আর সুনির্দিষ্টভাবে শেখ মুজিব জাতির পিতা নেই। এখন মার্কিন স্টাইলে করা হয়েছে Founding Fathers. অর্থাৎ জাতির প্রতিষ্ঠাতা পিতৃবৃন্দ। আমেরিকায় রয়েছেন à§­ জন জাতির পিতা। এরা হলেন জর্জ ওয়াশিংটন, জন এ্যাডামস, টমাস জেফারসন, বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, জন জে এবং জেমস ম্যাডিসন। বাংলাদেশে সেই একই স্টাইলে করা হয়েছে জাতির চারজন পিতা। এরা হলেন মওলানা ভাষানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান। 

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বৃহত্তর স্বায়ত্ত শাসনের দাবিতে ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। এই ৬ দফা ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু ৬ দফা কোনো বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। 

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আমি দেখেছি। সেটি হয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ঐ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্য থেকে কয়েক জন নেতার জন্ম হয়। এরা হলেন জনাব তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং সিরাজুল আলম খান। এরমধ্যে সিরাজুল আলম খান, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং নূরে আলম সিদ্দিকী ইন্তেকাল করেছেন। ঐ অভ্যুত্থানের সময় আমি ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি শহর দেখেছি। কিন্তু এবার যে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব দেখলাম সেটি ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের চেয়ে ছিল আরো ব্যাপক, আরো বিশাল। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানও স্থায়ী হয়েছিল ২ থেকে আড়াই মাস। শহীদের সংখ্যা ৬১ জন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। জেনারেল আইয়ুব খানের নিকট থেকে ক্ষমতা নিয়েছিলেন জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। 

আমি ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান দেখেছি। ঐ অভ্যুত্থান হয়েছিল মিলিটারি ডিক্টেটর লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে। এটিও হয়েছিল ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান। পরবর্তীতে বিএনপি সেখানে শামিল হয়। এই অভ্যুত্থানের মারফত ছাত্রদের মধ্যথেকে কয়েক জন রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়। এরা হলেন আমানুল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ। এই গণঅভ্যুত্থান ১৯৯০ সালে ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় à§© ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল। এই ৫৪ দিনে শহীদ হন ৩৬ জন ছাত্র ও জনতা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ৯০ এর এই গণঅভ্যুত্থান ছিল প্রধানত ঢাকা কেন্দ্রিক। এমনকি প্রত্যেকটি মফস্বল জেলা শহরেও (বিভাগীয় সদর ছাড়া) সেটা সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ’৯০ এ এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গণঅভ্যুত্থান হলেও ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে সাংবিধনিক পন্থায়।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান যেমন হয়েছিল সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় তাই তার সমাপ্তি অর্থাৎ ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এই অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বাতিল করা হয়। 

দুই.

আর সবশেষে দেখলাম গত বছরের জুলাই আগস্টের বিপ্লব। অবশ্য এটি কি ছিল বিপ্লব? নাকি গণঅভ্যুত্থান? এ নিয়ে রাষ্ট্র চিন্তকদের মতামত দুই রকম। কেউ বলেন এটি বিপ্লব নয়, ছিল গণঅভ্যুত্থান। আবার অন্যেরা বলেন, এটি ছিল বিপ্লব। আমি আমার মতামত দেওয়ার আগে দৈনিক সংগ্রামের পাঠক ভাইদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই হ্যামিলনের বংশীবাদকের গল্পটি। হ্যামিলন যখন কোনো এলাকায় এসে বাঁশি বাজাতেন তখন পিলপিল করে কিশোর ও তরুণরা রাস্তায় নেমে আসতো। যারা রাস্তায় নেমে আসতো তাদের সংখ্যা ছিল অজ¯à§à¦°à¥¤ 

২৪ এর অভ্যুত্থান বা বিপ্লব ছিল ঠিক সেরকম। বিপ্লবের আওয়াজ উঠেছিল ঠিকই এবং ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে এসেছিলেন কোটি কোটি মানুষ। মাত্র ২১ দিন স্থায়ী ছিল এই বিপ্লব। কিন্তু এই ২১ দিনে ঘটেছে বিপুল রক্তপাত, যা ইতোপূর্বে বাংলা, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল প্রভৃতি কোথাও দেখা যায়নি। মাত্র ২১ দিনে শহীদ হয়েছেন ১ হাজার ৫০০ ছাত্র জনতা। আহত হয়েছেন ২৬ হাজার ছাত্র জনতা। চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক প্রধান উপদেষ্টাকে জানান যে, এখন পর্যন্ত চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৭৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৯ জনের দুই চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এক চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৫০ জনের। এখন পর্যন্ত চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৬৫ জনের চোখ ভাল হয়েছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক মুহাম্মদ আবুল কেনান জানান, এখন পর্যন্ত সেখানে ২১ জনের হাত অথবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

 

তিন.

আমি এই দেশে সংঘটিত আগের কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের বিবরণ দিয়েছি কোনো অভ্যুত্থানকে খাটো করার জন্য নয়। প্রতিটি অভ্যুত্থানই কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যে মন্ডিত থাকে। ২৪ এর অভ্যুত্থানকে বলা হয় জেন জেড রেভুলুশন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে প্রধানত তরুণদের দ্বারাই এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। ৬৯ এর অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু খেতাব দেন। তারপর থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু নামে ডাকা হয়। সেই অভ্যুত্থান সামরিক অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। তারপর কালো ২৫ এর রাত। অতঃপর ৯০ লক্ষ শরণার্থীর ভারতে গমন। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে থেকেছেন, ভারতে ছিল তাদের আহার ও বাসস্থান, ভারতের সামরিক বাহিনী তাদেরকে গেরিলা ট্রেনিং দিয়েছে। অতঃপর ভারতীয় অস্ত্র নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাকআপ সাপোর্ট নিয়ে তারা পাক বাহিনীর ওপর এ্যাম্বুশ করেছেন। তারপরেও ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতকে সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল।

এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী গত ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় জনগণের উদ্দেশে প্রদত্ত বাণীতে বলেছেন, এটি ছিল ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ভারতীয়রা জয়লাভ করেছে। নরেন্দ্র মোদির ভাষণে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিব, মুক্তি বাহিনী, যৌথ বাহিনী- ইত্যাদি কোনো কিছুর উল্লেখ নাই। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় সুবিধা ছিল এই যে পাকিস্তান বাহিনী যখন তাদেরকে তাড়া করতো তখন পেছনে তাদের ছিল নিরাপদ শেল্টার। সেটি হলো বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ আসাম, মেঘালয় প্রভৃতি ভারতীয় রাজ্য। তারপরেও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। আমাদের স্বাধীনতার অহংকার। 

চার.

২৪ এর বিপ্লবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এই বিপ্লবে প্রত্যক্ষভাবে ছিল না কোনো রাজনৈতিক দল। ছিল না কোনো রাজনৈতিক নেতা। নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, আব্দুল কাদের, আবু সোহেল, নুসরাত তাবাসসুম, উমামা ফাতেমা প্রমুখ একঝাঁক টগবগে তরুণ ও তরুণীর নাম কেউ কোনো দিন গত ১৬ জুলাইয়ের আগে শোনেনি। পুলিশের গুলীর সামনে স্বেচ্ছায় বুক পেতে দিয়ে শহীদ হওয়ার কাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তেমনি বিরল মুগ্ধের কাহিনী। এদের নাম কেউ কোনোদিন শোনেনি। তারপরেও তাদের ডাকেই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন অফিসের কর্মচারি, কারখানার শ্রমিক, রাস্তার রিক্সাওয়ালা এবং ক্ষেত খামারের কৃষক। একদিকে যেমন রক্তক্ষয়ী এ ঘটনা, অন্যদিকে তেমনি অভূতপূর্ব সেই আবালবৃদ্ধবনিতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। 

আর সেজন্যই তো বিপ্লবের মাত্র à§« মাসের মধ্যেই স্কুলের ছেলেদের পাঠ্য বইয়ে স্থান করে নিয়েছেন এইসব তরুণ বিপ্লবী। 

ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তি, যিনি à§§/à§§à§§ তে জেনারেল মঈনের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ক্ষমতা গ্রহণ করেননি, সেই জগতবিখ্যাত নোবেল বিজয়ী ইউনূস নাহিদ, সারজিস, আসিফদের টেলিফোনিক কলে সাড়া দেন সুদূর ফ্রান্সে বসে থেকে। শুধু সাড়া দেওয়া নয়, বিপ্লবের পরিসমাপ্তিতে পরিপক্ব নেতৃত্বের অভাব যখন প্রকট তখন এই অসাধারণ মানুষটি বিপ্লবের হাল ধরেন। 

এতকিছুর পরেও একটি কথা না বললে আমার বিবেকের কাছে আমি দায়ী থাকবো। আর সেটা হলো, বিপ্লবটি সংঘটিত হলো সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে। ড. ইউনূস দেশ চালানোর বা ক্ষমতার ম্যান্ডেট পেলেন ১৭ কোটি মানুষের নিকট থেকে। যে দিকই বিচার করুন না কেন, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, চীনা বিপ্লব, মার্কিন বিপ্লব- সব বিবেচনাতেই এটি ছিল একটি বিপ্লব। অথচ ৮ আগস্ট বর্তমান সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়ে সেই বিপ্লবী সরকার সংবিধানের মধ্যে ঢুকে পড়লো। তারপর থেকেই বিপ্লব বনাম সাংবিধানিকতা- এই বিতর্ক চলছেই। আমি জানি না, এই বিতর্কের অবসান কোন পথে? কবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ